তাশরীক্বের দিনগুলিতে মিনায় রাত্রি যাপন: হুকুম ও বিধি-বিধান

হজের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি অংশ মিনায় কাটাতে হয়। ১০ জিলহজের ব্যস্ত আমল শেষে হাজীরা আবার মিনায় ফিরে আসেন এবং তাশরীকের রাতগুলো সেখানে অবস্থান করেন। এই রাত্রিযাপন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক নিয়ম নয়; বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ, আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আনুগত্য এবং হজের ধারাবাহিক আমল সঠিকভাবে সম্পন্ন করার অংশ। হজ্জের নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি সম্পর্কেও আগে থেকে ধারণা থাকলে এসব আমল বুঝতে আরও সহজ হয়।

তাশরীক্বের দিনগুলিতে মিনায় রাত্রি যাপন: হুকুম ও বিধি-বিধান

তাশরীকের দিনগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ ۚ فَمَنْ تَعَجَّلَ فِي يَوْمَيْنِ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَنْ تَأَخَّرَ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ لِمَنِ اتَّقَىٰ ۗ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّكُمْ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ”

অর্থ: “আর তোমরা নির্ধারিত কয়েকটি দিনে আল্লাহকে স্মরণ করো। অতঃপর যে ব্যক্তি দুই দিনের মধ্যে তাড়াতাড়ি চলে যাবে, তার কোনো গুনাহ নেই। আর যে বিলম্ব করবে, তারও কোনো গুনাহ নেই—যদি সে তাকওয়া অবলম্বন করে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, তোমাদের তাঁর কাছেই সমবেত করা হবে।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২০৩)

এ সময় হাজী মিনায় অবস্থান করে সালাত, তাকবির, তাসবিহ, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে নিজের হজযাত্রাকে আরও অর্থবহ করে তোলেন। মিনার সরল পরিবেশ হাজীকে ধৈর্য, শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার শিক্ষা দেয়। ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজে মিনায় রাত্রিযাপনের নিয়ম, ১২ জিলহজ মিনা ত্যাগের সময় এবং ওজরের বিধান নিয়ে অনেক হাজির প্রশ্ন থাকে। এই লেখায় কুরআন, সহিহ হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিষয়গুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

একনজরে মিনায় রাত্রিযাপনের হুকুম ও বিধান

তাশরীকের রাতগুলো মিনায় কাটানো হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। যাদের ওপর হজ্জ ফরজ হয়েছে, তাদের জন্য মিনায় রাত্রিযাপনের বিধানসহ হজের প্রতিটি আমল সঠিকভাবে জানা জরুরি। কত রাত থাকতে হবে, রাতের কতটুকু সময় অবস্থান করতে হবে এবং শরয়ি ওজরের ক্ষেত্রে কী বিধান প্রযোজ্য—এসব বিষয় আগে থেকে জানা থাকলে হাজীর জন্য আমলটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সহজ হয়।

  • তাড়াতাড়ি মিনা ত্যাগকারী হাজী: ১০ জিলহজ সূর্যাস্তের পর এবং ১১ জিলহজ সূর্যাস্তের পর—এই দুই রাত মিনায় অবস্থান করবেন। অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজের রাত মিনায় কাটাবেন।
  • ১৩ জিলহজ পর্যন্ত অবস্থানকারী হাজী: তিনি অতিরিক্তভাবে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পরের রাতও মিনায় থাকবেন। অর্থাৎ মোট তিন রাত অবস্থান করবেন।
  • রাত্রিযাপনের পরিমাণ: জমহুর আলেমের মতে, মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত সময়ের অর্ধেকের বেশি মিনার সীমানার মধ্যে অবস্থান করতে হবে।
  • ঘুমানো শর্ত নয়: মিনার সীমানার মধ্যে তাঁবুতে বসে থাকা, সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির বা বিশ্রামের মাধ্যমে সময় কাটালেও রাত্রিযাপন সম্পন্ন হবে।
  • বিনা ওজরে রাত্রিযাপন ত্যাগ: জমহুর ফকিহের মতে, এতে হজের একটি ওয়াজিব আমল ছুটে যায়। কত রাত বা কতটুকু সময় ছুটেছে—তার ভিত্তিতে দম, সদকা বা অন্য ক্ষতিপূরণের বিধান নিয়ে ফকিহদের মতপার্থক্য রয়েছে।
  • শরয়ি ওজর থাকলে: অসুস্থতা, হাজীদের অপরিহার্য সেবা, নিরাপত্তা বা চিকিৎসার দায়িত্ব এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করেও মিনায় স্থান না পাওয়ার মতো গ্রহণযোগ্য ওজরে অনেক আলেম কোনো দম আবশ্যক বলেননি।

তাশরীক্বের দিন বলতে কোন দিনগুলো বোঝায়?

১১, ১২ ও ১৩ জিলহজকে আইয়ামে তাশরীক বা তাশরীক্বের দিন বলা হয়। এগুলো কোরবানির ঈদের পরের তিন দিন। এই সময় হাজীরা মিনায় অবস্থান করেন, নির্ধারিত নিয়মে জামরাগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করেন এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“أَيَّامُ التَّشْرِيقِ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرٍ لِلَّهِ”

অর্থ: “তাশরীকের দিনগুলো খাওয়া, পান করা এবং আল্লাহকে স্মরণ করার দিন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৪১)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাশরীকের দিন শুধু হজের ব্যস্ত আনুষ্ঠানিকতার সময় নয়। এগুলো আল্লাহর নিয়ামত গ্রহণ, জিকির, তাকবির এবং ইবাদতের বিশেষ দিন।

তাশরীক্বের দিনগুলিতে মিনায় রাত্রি যাপন কি ওয়াজিব?

মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, তাশরীকের রাতগুলোতে মিনায় থাকা ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে এই রাতগুলো মিনায় কাটিয়েছেন। বিশেষ দায়িত্বে নিয়োজিত কিছু সাহাবিকে তিনি আলাদা অনুমতি দিয়েছিলেন। সাধারণ হাজীর জন্য এমন অনুমতি না থাকা থেকেই অধিকাংশ ফকিহ এর আবশ্যকতা বুঝেছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত:

“ثُمَّ رَجَعَ إِلَى مِنًى فَمَكَثَ بِهَا لَيَالِيَ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ”

অর্থ: “এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ মিনায় ফিরে এলেন এবং তাশরীকের রাতগুলো সেখানে অবস্থান করলেন।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৯৭৩)। একই বর্ণনায় তাশরীকের দিনগুলোতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জামরায় কংকর নিক্ষেপের আমলও উল্লেখ করা হয়েছে।

হানাফি মাজহাবে মিনায় রাত্রিযাপনের হুকুম

হানাফি ফিকহের গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়ে কিছু পরিভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। অনেক হানাফি ফকিহ মিনায় রাত্রিযাপনকে সুন্নাহ বলেছেন এবং বিনা ওজরে তা ত্যাগ করাকে মাকরুহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ মত অনুযায়ী শুধু রাত্রিযাপন না করার কারণে দম অপরিহার্য হয় না। অন্যদিকে কিছু হানাফি গবেষক ও ব্যাখ্যাকার মিনার বাইরে রাত্রিযাপনকে মাকরুহে তাহরিমি বলেছেন এবং আমলটির ওয়াজিবসদৃশ গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশি হাজীদের করণীয়: মতপার্থক্যকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে মিনায় থাকা বাদ দেওয়া ঠিক নয়। নিরাপদ পদ্ধতি হলো নির্ধারিত রাতগুলো যথাযথভাবে মিনায় কাটানো এবং বিশেষ সমস্যা হলে নিজের কাফেলার শরিয়াহ গাইড বা নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

কোন কোন রাত মিনায় থাকতে হয়?

ইসলামি দিন সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয়। তাই তারিখের হিসাব বুঝতে অনেক হাজীর ভুল হয়। ১২ জিলহজের কংকর নিক্ষেপ শেষে সূর্যাস্তের আগে মিনা ছাড়াকে তাআজ্জুল বলা হয়। আর ১৩ জিলহজ পর্যন্ত থেকে ওই দিনের কংকর নিক্ষেপ শেষে বের হওয়াকে তাআখখুর বলা হয়। উভয়টির অনুমতি কুরআনে রয়েছে। তবে রাসুলুল্লাহ ﷺ ১৩ জিলহজ পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন বলে অনেক আলেম বিলম্ব করে থাকা উত্তম বলেছেন। সহজভাবে সময়সূচি নিচে দেওয়া হলো।

মিনায় হজের রাতে থাকার নির্দেশনা
সময় হাজীর করণীয়
১০ জিলহজ সূর্যাস্তের পর মিনায় ফিরে রাত কাটাতে হবে। এটি ১১ জিলহজের রাত
১১ জিলহজ দিনের আমল নির্ধারিত সময়ে তিন জামরায় কংকর নিক্ষেপ
১১ জিলহজ সূর্যাস্তের পর দ্বিতীয় রাত মিনায় কাটাতে হবে। এটি ১২ জিলহজের রাত
১২ জিলহজ কংকর নিক্ষেপের পর তাড়াতাড়ি ফিরতে চাইলে সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ
১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পর মিনায় থেকে গেলে সাধারণ নিয়মে আরও এক রাত অবস্থান
১৩ জিলহজ তিন জামরায় কংকর নিক্ষেপ করে মিনা ত্যাগ

মিনায় কতক্ষণ থাকলে রাত্রিযাপন পূর্ণ হবে?

রাত্রিযাপনের জন্য পুরো রাত ঘুমিয়ে থাকা জরুরি নয়। ফিকহের ভাষায় মূল বিষয় হলো নির্ধারিত সময় মিনার সীমানার মধ্যে অবস্থান করা। জমহুর ফকিহের মতে, মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত মোট সময়ের অর্ধেকের বেশি মিনায় থাকতে হবে। রাতের প্রথম অংশ অথবা শেষ অংশ—যেকোনো অংশে থাকা যেতে পারে। তবে মোট অবস্থান রাতের অর্ধেকের বেশি হওয়া প্রয়োজন।

ধরা যাক, কোনো রাতে মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত সময় ১০ ঘণ্টা। সে ক্ষেত্রে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় মিনার মধ্যে অবস্থান করলে অধিকাংশ আলেমের হিসাবে রাতের বেশির ভাগ সময় সেখানে কাটানো হবে। ঠিক ১২টা বাজাকে শরয়ি মধ্যরাত ধরে নেওয়া যাবে না। মাগরিব ও ফজরের মধ্যবর্তী সময় হিসাব করতে হবে।

হাজীদের মিনায় ঘুমানো কি বাধ্যতামূলক?

না। হাজীদের মিনায় ঘুমানো রাত্রিযাপনের শর্ত নয়। হাজী তাঁবুতে বসে থাকলে, সালাত পড়লে, কুরআন তিলাওয়াত করলে, জিকির করলে কিংবা শারীরিক কারণে ঘুমাতে না পারলেও রাত্রিযাপন হয়ে যাবে। এমনকি নির্ধারিত তাঁবুর পরিবর্তে মিনার সীমানার মধ্যে কোনো নিরাপদ অনুমোদিত স্থানে বা যানবাহনে অবস্থান করলেও মূল বিবেচনা হবে তিনি মিনার সীমানার ভেতরে ছিলেন কি না। তবে নিরাপত্তা ও সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে।

তাওয়াফে ইফাদা বা সাঈ করতে মক্কায় গেলে করণীয় কী?

অনেক হাজী ১০ জিলহজ অথবা পরবর্তী দিনে তাওয়াফে ইফাদা ও সাঈ করার জন্য মক্কায় যান। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কাজ শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিনায় ফিরে আসতে হবে। মক্কার হোটেলে বিশ্রাম নিতে গিয়ে পুরো রাত অথবা রাতের অধিকাংশ সময় বাইরে কাটিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। যাওয়ার আগে যানজট, বাসের সময়, হাঁটার দূরত্ব এবং মিনায় ফেরার সম্ভাব্য সময় হিসাব করা দরকার। বিশেষ করে বয়স্ক হাজী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গেলে দল থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়াই নিরাপদ।

১২ জিলহজ সূর্যাস্ত হয়ে গেলে হাজীদের করণীয়

যিনি ১২ জিলহজ কংকর নিক্ষেপ শেষে তাড়াতাড়ি মিনা ত্যাগ করতে চান, তাঁকে সূর্যাস্তের আগেই বের হতে হবে। সূর্যাস্তের সময়ও যদি তিনি স্বাভাবিকভাবে মিনায় অবস্থান করেন এবং বের হওয়ার উদ্যোগ না নিয়ে থাকেন, তাহলে সাধারণ ফিকহি বিধান অনুযায়ী তাঁকে আরও এক রাত থাকতে হবে। এরপর ১৩ জিলহজ কংকর নিক্ষেপ করে বের হবেন।

তবে হাজী বের হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করার পর যানজট, গাড়ি না চলা বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে মিনার সীমানা পার হতে দেরি হলে কিছু আলেম তাকে তাআজ্জুলকারী হিসেবেই গণ্য করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে নিজের দলের আলেম বা শরিয়াহ পরামর্শকের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা উচিত।

ওজরের কারণে মিনার বাইরে থাকার বিধি-বিধান

শরিয়তে কিছু গ্রহণযোগ্য ওজরের ক্ষেত্রে মিনার বাইরে থাকার অনুমতি রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ হাজীদের পানি সরবরাহের দায়িত্বে থাকা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে মক্কায় রাত কাটানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। হাদিসে এসেছে:

“أَنَّ الْعَبَّاسَ بْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ اسْتَأْذَنَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَنْ يَبِيتَ بِمَكَّةَ لَيَالِيَ مِنًى مِنْ أَجْلِ سِقَايَتِهِ فَأَذِنَ لَهُ”

অর্থ: “আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্বের কারণে মিনার রাতগুলো মক্কায় কাটানোর অনুমতি চাইলে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে অনুমতি দেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৭৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৩১৫)

উটের রাখালদেরও তাদের দায়িত্বের কারণে মিনার বাইরে রাত কাটানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য অনুমতির এই বর্ণনাগুলো সাধারণ হাজীর ক্ষেত্রে মিনায় থাকার গুরুত্ব প্রমাণ করে। বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য ওজরের মধ্যে থাকতে পারে:

  • গুরুতর অসুস্থতা বা চিকিৎসার প্রয়োজন
  • অসুস্থ বা অক্ষম হাজীর অপরিহার্য সেবায় নিয়োজিত থাকা
  • চেষ্টা করেও মিনার মধ্যে কোনো স্থান না পাওয়া
  • কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় মিনার বাইরে সংলগ্ন ক্যাম্প বরাদ্দ পাওয়া
  • নিজের বা অন্য হাজীর জীবন ও স্বাস্থ্যের বাস্তব ঝুঁকি
  • হাজীদের অপরিহার্য চিকিৎসা, নিরাপত্তা বা সেবার দায়িত্ব

তবে শুধু আরাম, ভালো ঘুম, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হোটেল বা ভিড় এড়ানোর সাধারণ ইচ্ছাকে ওজর হিসেবে ধরা যায় না। কোনো অবস্থা শরয়ি ওজর কি না, তা নিজে অনুমান না করে আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

মিনায় তাঁবু না পেলে করণীয় কী?

হজের সময় মিনায় প্রচণ্ড ভিড় হয়। কোনো কোনো দেশের বা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্প মিনার শেষ সীমানার পর মুযদালিফার দিকে বরাদ্দ হতে পারে। এ অবস্থায় হাজীর প্রথম কাজ হলো নিজের ক্যাম্প পরিচালককে জিজ্ঞাসা করা এবং মিনার মধ্যে বৈধ স্থান পাওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। চেষ্টা করেও স্থান না পাওয়া গেলে মিনার তাঁবুগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত নিকটবর্তী বরাদ্দকৃত ক্যাম্পে থাকা যাবে বলে বহু আলেম মত দিয়েছেন।

এমন অনিবার্য অবস্থায় হাজী সামর্থ্যের বাইরে কোনো কাজের জন্য দায়ী হবেন না এবং অনেক আলেমের মতে তাঁর ওপর ফিদইয়া বা দমও থাকবে না। কিন্তু নিজের সুবিধামতো মক্কার হোটেলে ফিরে যাওয়া এবং পরে “মিনায় তাঁবু পাইনি” বলা যথেষ্ট নয়। স্থান খোঁজার বাস্তব চেষ্টা, দলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।

নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ হাজীদের জন্য মিনায় রাত যাপনের বিধান

শুধু নারী বা বৃদ্ধ হওয়ার কারণে মিনায় রাত্রিযাপনের বিধান বাতিল হয় না। তাঁরা নিরাপদে থাকতে সক্ষম হলে অন্য হাজীদের মতোই মিনায় থাকবেন। তবে গুরুতর অসুস্থতা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, চিকিৎসকের নিষেধ, ভিড়ে স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা অথবা অপরিহার্য পরিচর্যার প্রয়োজন হলে ওজরের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

কিছু আলেম দুর্বল নারী, শিশু ও অসুস্থদের ক্ষেত্রে অধিকতর সহজ মত গ্রহণ করেছেন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত হজে যাওয়ার আগেই চিকিৎসক, কাফেলার শরিয়াহ গাইড এবং দায়িত্বশীল পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে রাখা ভালো। ইহরামে থাকা নারীদের জন্য আলাদা কিছু মাসআলা রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মহিলাদের ইহরামের নিয়ম পড়তে পারেন।

বিনা ওজরে মিনায় রাত না থাকার বিধান

গ্রহণযোগ্য শরয়ি ওজর ছাড়া তাশরীকের নির্ধারিত রাতগুলো মিনায় না থাকার বিধান নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। জমহুর তথা মালিকি, শাফেয়ি হাম্বলি মাজহাবের আলেমদের মতে, মিনায় রাত্রিযাপন হজের একটি ওয়াজিব আমল। তাই কোনো হাজী বিনা ওজরে সব রাত মিনার বাইরে কাটালে তাঁর ওপর দম আবশ্যক হতে পারে। এক রাত বা রাতের কিছু অংশ ছুটে গেলে সদকা বা অন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সম্পর্কে আলেমদের ভিন্ন মত রয়েছে।

হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, তাশরীকের রাতে মিনায় থাকা সুন্নাহ। বিনা ওজরে এটি ত্যাগ করা অনুচিত ও মাকরুহ হলেও শুধু এ কারণে দম আবশ্যক হয় না। তবে কিছু হানাফি ফকিহ মিনায় রাত্রিযাপনকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন এবং বিনা ওজরে তা ত্যাগ করাকে মাকরুহে তাহরিমি বলেছেন।

তাই মতপার্থক্যের সুযোগ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মিনায় রাত্রিযাপন বাদ দেওয়া উচিত নয়। কোনো রাত সম্পূর্ণ বা আংশিক ছুটে গেলে, কিংবা ওজর গ্রহণযোগ্য ছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহ হলে, ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে হজের মাসআলায় অভিজ্ঞ একজন নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মিনায় না থাকলে কি হজ বাতিল হয়ে যায়?

না, শুধু মিনায় রাত্রিযাপন না করার কারণে হজ বাতিল হয়ে যায় না। কারণ মিনায় রাত্রিযাপন হজের রুকন নয়। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, গ্রহণযোগ্য শরয়ি ওজর ছাড়া তাশরীকের নির্ধারিত রাতগুলো মিনায় না কাটালে হজের একটি ওয়াজিব আমল ছুটে যায় এবং সে ক্ষেত্রে দম বা অন্য ক্ষতিপূরণের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে হানাফি মাজহাবে এ বিষয়ে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

মিনায় রাত্রিযাপনের সময় করণীয় আমল সমূহ

মিনার রাত শুধু ঘুম বা অপেক্ষার সময় নয়। এটি হজের শান্ত, গভীর ও স্মরণীয় একটি অংশ। সারাদিনের ক্লান্তির পর হাজী এখানে নিজের অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এই সময় করা যেতে পারে:

মিনায় রাত্রিযাপনের সময় করণীয় আমল সমূহ
  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায়
  • ফরজ সালাতের পর তাকবিরে তাশরীক পাঠ
  • কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ নিয়ে চিন্তা
  • তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা
  • নিজের পরিবার ও উম্মাহর জন্য দোয়া
  • হজ কবুল হওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে প্রার্থনা
  • পরদিনের কংকর নিক্ষেপ ও যাত্রার প্রস্তুতি
  • দুর্বল ও বয়স্ক হাজীদের সহযোগিতা
নোট: অনর্থক গল্প, উচ্চস্বরে কথা, ঝগড়া, অন্যের বিশ্রামে বাধা এবং অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

মিনায় থাকার সময় সাধারণ কিছু ভুল

মিনায় অবস্থানের সময় তারিখ, সীমানা, রাত্রিযাপনের সময় এবং মিনা ত্যাগের নিয়ম নিয়ে অনেক হাজী অনিচ্ছাকৃত ভুল করেন। আগে থেকেই এসব সাধারণ ভুল সম্পর্কে জানা থাকলে হজের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো আরও সতর্কতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পন্ন করা সহজ হয়।

  • মিনার বাইরের হোটেলকে মিনার অংশ মনে করা: মিনার কাছাকাছি কোনো ভবন বা হোটেল থাকলেই সেটি মিনার সীমানার মধ্যে হয়ে যায় না। অবস্থান নিশ্চিত করতে ক্যাম্প পরিচালক বা অনুমোদিত মানচিত্রের সহায়তা নিন।
  • রাত ১২টাকে শরয়ি অর্ধরাত ধরা: শরয়ি অর্ধরাত নির্ধারিত হয় মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত সময় ভাগ করে। সাধারণ ঘড়ির রাত ১২টা সব সময় অর্ধরাত নয়।
  • তাওয়াফ শেষে মক্কাতেই থেকে যাওয়া: তাওয়াফে ইফাদা বা সাঈ শেষে মিনায় ফিরে আসতে হবে। ক্লান্তি বা যানজটের সম্ভাবনা আগেই পরিকল্পনায় রাখা দরকার।
  • ১২ জিলহজ বের হতে দেরি করা: তাআজ্জুল করতে চাইলে কংকর নিক্ষেপ, মালপত্র গুছানো ও পরিবহনের প্রস্তুতি সময়মতো শেষ করুন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করলে সূর্যাস্ত হয়ে যেতে পারে।
  • তাঁবু না পাওয়াকে নিজে থেকেই ওজর ধরে নেওয়া: প্রথমে কাফেলা পরিচালক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। যথাসাধ্য চেষ্টা না করে হোটেলে চলে যাওয়া গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়।
  • নিজের মতো করে দমের সিদ্ধান্ত নেওয়া: এক রাত, দুই রাত অথবা সব রাত ছুটে যাওয়ার বিধান এক নয়। মাজহাব ও ওজরভেদেও সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে। তাই নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ জরুরি।

মিনায় রাত্রিযাপনের আধ্যাত্মিক শিক্ষা

মিনা হাজীকে সরলতা শেখায়। একই ধরনের তাঁবু। সীমিত জায়গা। পরিচিত আরামের অনেক কিছুই সেখানে থাকে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ভাষার মানুষ একই উদ্দেশ্যে পাশাপাশি অবস্থান করেন। এই কয়েকটি রাত মনে করিয়ে দেয়, মানুষের আসল মর্যাদা সম্পদ, পোশাক বা সামাজিক অবস্থানে নয়। আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া।

সুরা আল-বাকারার ২০৩ নম্বর আয়াতেও তাড়াতাড়ি বা বিলম্ব করে মিনা ত্যাগের অনুমতির সঙ্গে তাকওয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই মিনায় থাকা কেবল একটি স্থানগত নিয়ম নয়। এটি আনুগত্য, ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজেকে সমর্পণের অনুশীলন।

সঠিক হজ প্রস্তুতির জন্য অভিজ্ঞ গাইডের সহায়তা নিন

হজের আমলগুলো তারিখ, সময় ও নির্ধারিত স্থানের সঙ্গে জড়িত। ছোট একটি ভুল অনেক সময় হাজীকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিতে পারে। তাই যাত্রার আগেই মিনায় অবস্থান, কংকর নিক্ষেপ, তাওয়াফে ইফাদা, সাঈ এবং মিনা ত্যাগের নিয়ম পরিষ্কারভাবে শেখা জরুরি।

হিজাজ হজ উমরাহ লিমিটেড বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীদের জন্য প্রাক-হজ প্রস্তুতি, বাংলা ভাষায় নির্দেশনা এবং যাত্রাপথে গাইড সহায়তা দিয়ে থাকে। হজ প্যাকেজ ও প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে কল করুন ০১৩৩৫১৮৫৫২২

তাশরীক্বের দিন মিনায় রাত্রিযাপন সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

তাশরীক্বের দিন মিনায় কত রাত থাকতে হয়, কতক্ষণ অবস্থান জরুরি এবং ওজরের ক্ষেত্রে কী বিধান প্রযোজ্য—এসব নিয়ে হাজীদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন থাকে। নিচের প্রশ্নোত্তরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তাশরীকের দিন মোট তিনটি—১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ। কোরবানির ঈদের পরের এই দিনগুলোতে হাজীরা মিনায় অবস্থান করেন, নির্ধারিত সময়ে তিন জামরায় কংকর নিক্ষেপ করেন এবং বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করেন। হাদিসে তাশরীকের দিনগুলোকে খাওয়া, পান করা এবং আল্লাহকে স্মরণ করার দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২ জিলহজের আমল শেষে কেউ চাইলে সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করতে পারেন, আবার ১৩ জিলহজ পর্যন্ত অবস্থান করাও বৈধ।

তাড়াতাড়ি মিনা ত্যাগকারী হাজীকে দুই রাত মিনায় থাকতে হয়। অর্থাৎ ১০ জিলহজ সূর্যাস্তের পরের রাত এবং ১১ জিলহজ সূর্যাস্তের পরের রাত। যিনি ১৩ জিলহজ পর্যন্ত থাকবেন, তাঁকে আরও একটি রাত মিনায় কাটাতে হবে।

অধিকাংশ আলেমের মতে রাতের অর্ধেকের বেশি সময় মিনায় থাকলে রাত্রিযাপনের ওয়াজিব আদায় হয়। তবে কোনো জরুরি কাজ না থাকলে পুরো রাত মিনায় থাকাই নিরাপদ ও সুন্নাহর অধিক অনুসারী।

হ্যাঁ। ঘুমানো শর্ত নয়। মিনার সীমানার মধ্যে বসে থাকা, সালাত পড়া, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির বা বিশ্রাম করলেও রাত্রিযাপন আদায় হবে।

সাধারণ সুবিধা বা আরামের জন্য মক্কার হোটেলে রাত কাটানো উচিত নয়। অসুস্থতা, অপরিহার্য সেবা বা গ্রহণযোগ্য শরয়ি ওজর থাকলে বিধান আলাদা হতে পারে।

যথাসাধ্য চেষ্টা করার পরও মিনায় স্থান না পাওয়া গেলে এবং কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সংলগ্ন ক্যাম্পে থাকলে অনেক আলেমের মতে দম দিতে হবে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে চেষ্টা না করে বাইরে থাকলে একই বিধান প্রযোজ্য হবে না।

সাধারণভাবে, সূর্যাস্তের সময় হাজী মিনায় অবস্থান করলে এবং বের হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু না করলে তাঁকে আরও এক রাত থাকতে হবে। এরপর ১৩ জিলহজ কংকর নিক্ষেপ করে বের হবেন। যানজটে আটকে যাওয়ার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে আলেমদের ব্যাখ্যা রয়েছে।

না, হজ নষ্ট হয় না। মিনায় রাত্রিযাপন হজের রুকন নয়। তবে জমহুর আলেমের মতে বিনা ওজরে এটি ত্যাগ করলে ওয়াজিব ছুটে যায় এবং দম বা অন্য ক্ষতিপূরণের বিধান আসতে পারে।

Apply for an Umrah visa and experience the hassle-free journey to the city of Makkah.

Arrow